এলেঙ্গায় অপরাধের জাল! মাদক, চাঁদাবাজি ও ‘হানিট্র্যাপ’ ঘিরে তোলপাড়
- প্রকাশিত : শনিবার, ২৪ অক্টোবর ২০২৬
- / ৩ বার পড়া হয়েছে
এলেঙ্গায় অপরাধের জাল!
মাদক, চাঁদাবাজি ও ‘হানিট্র্যাপ’ ঘিরে তোলপাড়
অভিযোগের তালিকায় উজ্জ্বল সরকারসহ একাধিক ব্যক্তির নাম, টার্গেটে ব্যবসায়ী-প্রবাসী ও শিক্ষক; নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
বিশেষ প্রতিবেদক,টাঙ্গাইলঃ
টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলার এলেঙ্গা পৌরসভা ও আশপাশের এলাকায় মাদক কারবার, চাঁদাবাজি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং কথিত ‘হানিট্র্যাপ’ বা ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয়, প্রভাবশালী মহলের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন সময়ে একাধিক অপরাধ চক্র সক্রিয় রয়েছে ওই এলাকায়।
অভিযোগের তালিকায় স্থানীয়ভাবে আলোচিত বেশ কয়েকজনের নাম উঠে এলেও ভুক্তভোগিরা তাদের নাম প্রকাশ করতে ভয় পায় ।পতিত সরকারের আমলের নির্বাচিত ইউপি চেয়ারম্যান, কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের স্থানীয় নেতা কর্মী ও অনুসারীরাই এক্ষেত্রে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে বেড়িয়ে এসেছে।কালিহাতী পৌরসভার মেয়র নুরু নবী সরকার,এলেঙ্গার মেয়র নুর আলম সিদ্দিকী,সল্লা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান,আব্দুল আলীম,গোহালিয়াবাড়ী ইউপি চেয়াদম্যান আব্দুল হাই আকন্দ,সাবেক চেয়ারম্যান হজরত আলী তালুকদার ,নারান্দিয়া ইউপি চেয়ারম্যান মাসুদ তালুকদার,দশকিয়া ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল মালেক ভূইয়া,সহদেবপুর ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদ,পাইকড়া ইউপিচেয়ারম্যান আজাদ হোসেন,বাংড়া ইউপি চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম,কোকডহরা ইউপি চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম,বল্লা ইউপি চেয়ারম্যান ফরিদ হোসেন,নাগবাড়ী ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল কাইয়ুম বিপ্লব,বীরবাসিন্দা ইউপি চেয়ারম্যান সোহরাব আলী,তালিকায় আরো আছেন,কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগের উপজেলা সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লা,শাহ আলম মোল্লা,আনিসুর রহমান মোল্লা,সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য ও সাবেক এমপি হাসান ইমাম খান সোহেল হাজারীর ক্যাডার আয়নাল হোসেন,সোহেল হাজারীর ঘনিষ্ঠ আত্মীয় খন্দকার আব্দুল মাতিন,কালিহাতী পৌরসভা সভাপতি আব্দুল মালেক তালুকদার,সাধারন সম্পাদক আলমগীর হোসেন,আলীগ নেতা আসলাম ভুট্টো,যুবলীগনেতা সেলিম তাদের সকলকেই মামলা হামলার ভয় দেখিয়ে এবং নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে অন্তরবর্তী কালিন সময়ে সুযোগ সন্ধানী চক্রটি বিএনপি রাজনৈতিক দলের একাধিক নেতার ছত্রছায়ায় প্রত্যেকের কাছ থেকে ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা হাতিনিয়েছেন বলে জনশ্রুতি আছে।এক্ষেত্রে বিএনপির একজন বিভাগীয় সহসাংগঠনিক সম্পেদকের ঘনিষ্ঠ সহচর ও উপজেলা বিএনপির কতিপয় নেতার নামসহ বিএনপির সাবেক কয়েকজন নেতার নাম প্রকাশ পেয়েছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে ওই অপরাধ চক্রটি তাদের অপরাধ কর্মকান্ড অব্যহত রাখতে বিএনপির পরিচয়কে মূলধন করে তাদের অপরাধ নির্ভিঘ্ন করেছেনছবলে স্থানীয়ভাবে জানা গেছে। এলেঙ্গা বাসস্ট্র্যান্ডে একজন হোমিও চিকিৎসকের ঔষধের দোকানে হামলা ও লুটপাটের মত ঘটণা ঘটলেও কেউ প্রতিবাদে মুখ খোলেন নাই,সম্প্রতি ওই হোমিও ডাক্তার দিলীপ চৌধুরী নীরবে দেশত্যাগ করার খবরও বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে।অপরাধ চক্রের সক্রিয় সদস্যরা এতোই ক্ষমতাশালী যে তারা শুধু নগদ টাকা পয়সা আদায় করেই ক্ষ্যান্ত হয়নি কারো কারো কাছ থেকে জোরজবরদস্তি করে ব্যাংক চেকের মাধ্যমেও চাঁদা আদায়ের খবরসহ সাবেক এক পুলিশ কর্মকর্তার আত্মীয়ের ইটভাটাও নিজেদের নামে লিখে নিয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।
ওই অপরাধচক্রটিকে এলেঙ্গায় সেল্টার দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে একজন ব্যবসায়ীনেতাসহ একাধিক বিএনপি নেতার নামও জোড়েশোরে প্রচার হচ্ছে।
৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে শিক্ষক লাঞ্চনা ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ
এলেঙ্গা অঞ্চলের কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ তুলে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের হেনস্তা করার অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি,এলেঙ্গা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমূল করিমকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামীলীগ নেতার ট্যাকদিয়ে সরকারের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ দিয়ে এবং শারিরীকভাবে লাঞ্চিত করার চেষ্টাকরে প্রায় ৩০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে একাধিক বিএনপি মদদে বৈষম্য বিরোধী আন্দোলনের কতিপয় সমন্বয়কের বিপক্ষে একই বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষকের কাছ থেকে জোরকরে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর নেওয়া এবং পরবর্তীতে কয়েক লাখ টাকার বিনিময়ে স্কুলে আসার সুযোগ করে দেয়াসহ সরকারি শামসুল হক কলেজের অধ্যক্ষ আনোয়ারুল কবিরকে তার বাড়ীর কাগজপত্রে ভুল বা তিনি কলেজের সরকারি জায়গা দখল করে ইমারত নির্মাণ করা ও উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক আনোয়ার হোসেন মোল্লার ঘনিষ্ঠ সহচর আখ্যাদিয়ে বৈষম্য বিরোধী ছাত্রজনতার আন্দোলনে হামলার মামলায় সম্পৃত্ত করার ভয়ভীতি প্রদর্শন করে চাপ সৃষ্টি করে অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটলেও প্রধান শিক্ষক নাজমুল করিম ও কলেজ অধ্যক্ষ আনোয়ারুল কবির হয়রানির কথা স্বীকার করলেও টাকা দেয়ানেয়ার বিষটি অস্বীকার করেছেন।এছাড়াও সাবেক এমপি সোহেল হাজারীর প্রতিষ্ঠিত শহীদ শাহেদ হাজারী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শামীম আল মামুনের কাছ থেকেও কয়েক লক্ষ টাকা আদায় করা হয়েছে বলেও জানাগেছে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভয়ভীতি প্রদর্শন কিংবা জোরপূর্বক অর্থ আদায়ের অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
চাঁদাবাজির অভিযোগ পুরোনো ও নতুনদের নাম আলোচনায়
স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, জমি কেনাবেচা,নতুন ভবন নির্মাণ, ব্যবসা-বাণিজ্য, বালু কারবার, মহাসড়ককেন্দ্রিক পণ্য পরিবহন এবং সালিশ-বিচারকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনধরে বিভিন্ন সময়ে অবৈধ অর্থ আদায়ের ঘটনা ঘটেছে ইতোপূর্বেও ।ওই সময়ে কালিহাতী উপজেলা আওয়ামীলীগের একজন প্রভাবশালীনেতাসহ যুবলীগ নেতা শাহ আলম মোল্লা, আনিস মোল্লা, শ্রমিকলীগ নেতা লতিফ মোল্লা, সহিদুল ইসলাম শান্তর নাম স্থানীয় অধিবাসীরা উল্লেখ করেছেন।
এ ছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজির অভিযোগের আলোচনায় থাকা উপজেলা বিএনপির এক তরুন নেতাসহ একজন ব্যবসায়ী নেতারসাথে রাজাবাড়ীর উজ্জ্বল সরকার, হারুনুর রশিদ মিনু, বাঁশীর মামুন, আবু তালেব এবং এলেঙ্গার মকবুল হোসেনের নামসহ বিএনপিপন্থি এক ব্যবসায়ী নেতার ব্যাপকহারে প্রচার হচ্ছে।তবে তারা সকলেই অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
মাদক কারবার নিয়েও অভিযোগঃ
স্থানীয়দের অভিযোগ, এলেঙ্গা ও আশপাশের কয়েকটি এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে মাদক কারবারের নেটওয়ার্ক সক্রিয় আছে। স্থানীয়দের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজাবাড়ীর উজ্জ্বল সরকার,আব্দুল মান্নান, চিনামুড়ার বর্ণ্যা, ইনছান, শামছুল ও শাহিদা, চেচুয়ার নুরু এবং পাথাইলকান্দির আব্দুল রশিদ ও আব্দুল্লাহর নামে মাদকসংক্রান্ত অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
উল্লেখ্য যে, এলেঙ্গার রাজাবাড়ী গ্রামের আব্দুল মান্নানকে ২০২৩ সনের ১৭ আগস্ট টাঙ্গাইল জেলার গোয়েদ্ধা পুলিশ( ডিবি দক্ষিণ) ১০ হাজার পিছ ইয়াবাসহ গ্রেফতার করে যার আনুমানিক মুল্য ৩০ লাখ টাকা এবং ওই দিনই কালিহাতী থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন আইনের বিভিন্ন ধারায় আটক দেখিয়ে আদালতে সোপর্দ করলে আদালত তাকে কারাগারে প্রেরন করেন। মান্নান অতিগুরুত্বপূর্ণ একজন জনপ্রতিনিধির আত্মীয় হওয়ার সুবাদে নতুন করে দাপুটে মাদক সম্রাট বনে গেছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি জানিয়েছেন।
হানিট্র্যাপের অভিযোগে আলোচনায় উজ্জ্বল সরকারঃ
এলেঙ্গার রাজাবাড়ী এলাকার উজ্জ্বল সরকারকে ঘিরে কথিত হানিট্র্যাপ ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের অভিযোগ স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, উজ্জল সরকার একঝাঁক সুন্দরী রমনীদের ব্যবহার করে একটি হানিট্রাপে নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন।
উজ্জল সরকার তার সহযোগীদের দিয়ে প্রথমে এলেঙ্গায় ৪/৫ টি ফ্লাটবাড়ী ভাড়া নিয়ে উত্তরবঙ্গের কতিপয় সুন্দরী রমনীদের দিয়ে দেহব্যবসা শুরু করেন,নারী দেহ ব্যবসার কাঁচা টাকা উজ্জল সরকারকে বেপরোয়া করে তুলে।তিনি অতিলোভে হানিট্র্যাপে জড়িয়ে পড়েন এবং প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী,বিভিন্ন এলাকার বিত্তশালী ব্যক্তি, প্রবাসফেরত তরুণ, চাকরিজীবী ও সরকারি কর্মকর্তাদের লক্ষ্য করে হানিট্র্যাপের ফাঁদ তৈরি করতে এলেঙ্গাসহ ঘাটাইল,মধুপুর ও টাঙ্গাইলে কয়েকটি ফ্লাট ভাড়া নিয়ে সুন্দরী রমনীদের ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।ওই সকল রমনীরা আগন্তক লোকদের ব্যক্তিগত মুহূর্তের ভিডিও ধারণ বা তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগও সামনে এসেছে। উজ্জল সরকার শুধু ফ্লাটবাড়ী বাড়া করেই নয়,ঘাটাইল,মধুপুর ও টাঙ্গাইল শহরের একাধিক আবাসিক হোটেল কর্ত়পক্ষের সাথে চুক্তি করে হানিট্রাপের নেটওয়ার্ক বিস্তৃত করেন। এক্ষেত্রে উজ্জল সরকার স্কুল কলেজ পড়ুয়া স্বল্প বয়সী সুন্দরী নারী,প্রবাসে থাকা ব্যক্তিদের সুন্দরী স্ত্রীদের অর্থের লোভ ও যৌনচাহিদা পুরনের জন্য ব্যবহার করে অঢেল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন বলে উজ্জল সরকারের এক সহযোগী জানিয়েছেন।
এ ঘটনায় একটি ৭ মিনিট ৯ সেকেন্ডের অডিও রেকর্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে এবং ওই ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ায় তা ” টক অব টাঙ্গাইল” এ পরিনত হয়েছে। রেকর্ডটিতে কথিত ফাঁদ তৈরির বিষয়ে কথোপকথনটি নেটিজেনদের মাঝে হাস্যরসের খোরাক জোগালেও তা স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে । ভিডিও ক্লীবটি প্রচারিত হলেও এর সত্যতা, কণ্ঠের পরিচয়টি অস্বীকার করেছেন উজ্জল সরকার। একই ঘটনায় বাঁশীর আলমগীর হোসেনের নাম স্থানীয়ভাবে আলোচনায় এলেও তার মতামত জানা সম্ভব হয়নাই ।
মাদক, চাঁদাবাজি ও ‘হানিট্র্যাপ’ এর বিষয়ে কালিহাতী থানার অফিসার ইনচার্জ কাইয়ুম খান সিদ্দিকী বলেন কেউ ওই সকল বিষয়ে থানায় কোন অভিযোগ করেননি,অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



















