৬০ টাকা দিয়ে শুরু, আজ সফল উদ্যোক্তা সবিতা বসাক
- প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১৯ অগাস্ট ২০২৫
- / ৪৮৩ বার পড়া হয়েছে
৬০ টাকা দিয়ে শুরু, আজ সফল উদ্যোক্তা সবিতা বসাক
সিঁদুর ঘোষ রাজকুমার (টাঙ্গাইল প্রতিনিধি)
করোনার কঠিন সময়ে যখন চারপাশে হতাশা, তখন মাত্র ৬০ টাকা পুঁজি করে টাঙ্গাইলের দেলদুয়ারের তরুণী সবিতা বসাক শুরু করেছিলেন আলুর চিপস বানানো। আজ সেই চিপসই তাঁকে এনে দিয়েছে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি। ফেসবুক থেকে অনলাইন মার্কেটপ্লেস—সবখানেই এখন তাঁর পণ্য পৌঁছায়। আর তাঁর উদ্যোগের নাম হয়েছে মেয়ের নামে—“রাই ফুড প্রোডাক্ট”।
শৈশব ও পড়াশোনা
সবিতা বসাক টাঙ্গাইল জেলার দেলদুয়ার উপজেলার পাথরাইল ইউনিয়নের নলশোঁধা গ্রামের বাসিন্দা। বাবা মহাদেব বসাক, মা স্বর্গীয় মায়া বসাক। চার ভাইবোনের মধ্যে তিনি সবার ছোট। ছোটবেলা থেকেই পড়াশোনায় মনোযোগী ছিলেন। বর্তমানে তিনি মাস্টার্স সম্পন্ন করেছেন।
২০১৮ সালের জানুয়ারিতে তাঁর বিয়ে হয় বাজিতপুরে। শ্বশুরবাড়ি টাঙ্গাইলের বাজিতপুরেই।
দুঃসময় ও সংগ্রামের শুরু
বিয়ের আগে সবিতার স্বামী শাড়ির ব্যবসা করতেন। কিন্তু সেই ব্যবসা ছিল ব্যাংক ও এনজিও ঋণের ওপর নির্ভরশীল। ২০১৯ সালে করোনার প্রভাবে ব্যবসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেলে সংসারে নেমে আসে দুঃসময়।
সবিতা বলছিলেন,
“২০১৯ সালে আমরা দুজনেই বেকার হয়ে পড়ি। ব্যাংক ও এনজিও ঋণের চাপ, সংসারের খরচ—সব মিলিয়ে দিশেহারা হয়ে গিয়েছিলাম। তখনই ভেবেছিলাম কিছু একটা করতেই হবে।”
অনুপ্রেরণা: সাভারের চিপস
২০১৯ সালে ঢাকায় বি সি এস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে গেলে সাভারে এক মাসির কাছ থেকে আলুর চিপস খাওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁকে অনুপ্রাণিত করে। সেই স্মৃতিই মাথায় ঘুরতে থাকে দুঃসময়ে।
২০২০ সালে কন্যা সন্তান “রাই” জন্ম নেওয়ার পর জীবনের দায় আরও বেড়ে যায়। মেয়েকে খাওয়ানোর মতো টাকাও তখন হাতে ছিল না। হঠাৎ একদিন মাথায় আসে—আলুর চিপস বানিয়ে বিক্রি করা যায় কি না।
উদ্যোক্তা হওয়ার সূচনা
হাতে ছিল মাত্র ৬০ টাকা। সেই টাকা দিয়ে কিনলেন ২ কেজি আলু। ভেজে বানালেন চিপস। শ্বশুরবাড়ির দোকানেই প্রথম বিক্রি শুরু করলেন ৫ টাকা দরে। দোকানের ক্রেতারা ভালোভাবে নিল, আবার অর্ডারও দিল।
সবিতা বাড়িতে চিপস বানাতেন, আর স্বামী দোকানে দোকানে সরবরাহ করতেন। এভাবেই বাড়তে থাকে বিক্রি ও দোকানের সংখ্যা।
অনলাইন জগতে সাফল্য
২০২০ সালেই ফেসবুক ও উইম্যান অ্যান্ড ই–কমার্স (উই) গ্রুপে যুক্ত হন সবিতা। নিয়মিত পোস্ট করতে করতে হঠাৎ একদিন একসাথে ৫০–৬০ কেজি চিপসের অর্ডার পান। সেটিই তাঁর জীবনের বড় মোড় ঘোরানো ঘটনা।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি মেয়ের নামেই উদ্যোগ ও ফেসবুক পেজের নাম রাখেন—“রাই ফুড প্রোডাক্ট”।
বৈচিত্র্যময় পণ্য
শুরুটা ছিল শুধু আলুর চিপস দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে তিনি বাড়াতে থাকেন পণ্যের তালিকা। এখন তাঁর উদ্যোগে পাওয়া যায়—
আলুর চিপস (সিগনেচার পণ্য)
বিভিন্ন ডালের বড়ি
নাড়ু-মোয়া
টাঙ্গাইল শাড়ি
পরিবারই শক্তি
সবিতা বসাকের উদ্যোক্তা জীবনে সবচেয়ে বড় প্রেরণা ছিলেন তাঁর স্বামী। স্বামী সবসময় পাশে থেকেছেন—বিপদে–আপদে, দোকান থেকে দোকানে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ করেছেন। এছাড়া দুই দাদা ও এক দিদিও সবসময় সাহস জুগিয়েছেন।
সবিতা বলেন,
“উদ্যোক্তা হওয়ার পথে আমি সবচেয়ে বেশি সাপোর্ট পেয়েছি আমার স্বামী, আমার দুই দাদা আর এক দিদির কাছ থেকে। আজ আমি যা করতে পারছি, তা সম্ভব হয়েছে তাঁদের ভরসা আর সাহসে।”
অনুপ্রেরণার গল্প
করোনাকালীন দুঃসময়, ঋণের চাপ আর নিরাশার মধ্যে থেকেও মাত্র ৬০ টাকা দিয়ে শুরু করেছিলেন সবিতা বসাক। আজ তাঁর পণ্য ছড়িয়ে গেছে টাঙ্গাইল ছাড়িয়ে অনলাইনে দেশের নানা প্রান্তে।
সবিতা প্রমাণ করেছেন—
উদ্যোগ নিতে সাহস থাকলে সামান্য টাকাই বড় স্বপ্নের বীজ বপন করতে পারে।
নারীরাও ঘরে বসে থেকে নয়, বরং নিজের মেধা ও শ্রম দিয়ে পরিবার ও সমাজে পরিবর্তন আনতে পারে।















